West Bengal Class 11 H.S 2nd Semester Bangla Chapter 1 Answer | পশ্চিমবঙ্গ একাদশ শ্রেণী (H.S.) দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা প্ৰথম অধ্যায়ের উত্তর | WBCHSE Class 11 H.S 2nd Semester Bangla Chapter 1 Answer | WBCHSE Class H.S 2nd Semester Bangla Chapter 1 ছুটি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর Question Answer | 2026

 Chapter 1

ছুটি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

প্রশ্নঃ ১ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তরঃ ‘নামকরণ’ অংশ অনুসরণে লেখো।

প্রশ্নঃ ২ ‘ছুটি’ গল্পটির ভাববস্তু ব্যাখ্যা করো।

উত্তরঃ ‘বিষয়বস্তু’ অংশ অনুসরণে লেখো।

প্রশ্নঃ ৩ ছোটোগল্প হিসেবে ‘ছুটি’ গল্পটি কতটা সার্থক হয়ে উঠেছে, তা আলোচনা করো। 

উত্তরঃ ভূমিকা: বাংলা ছোটোগল্পের সার্থক স্রষ্টা হলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনিই প্রথম ‘ছোটোগল্প’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ছোটোগল্প কেবল ভাবাশ্রয়ী-কল্পনামুখ্য নয়, বরং জীবননির্ভর এবং এতে রয়েছে খণ্ড কাহিনির ব্যবহার।

ছোটোগল্পকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ‘বর্ষা যাপন’ কবিতায় বলেছিলেন,

“নাহি বর্ণনার ছটা               ঘটনার ঘনঘটা, 

                                      নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ। 

   অন্তরে অতৃপ্তি রবে             সাঙ্গ করি মনে হবে 

                                     শেষ হয়ে হইল না শেষ।”

ব্যাখ্যা: ‘ছুটি’ গল্পটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে প্রাকৃতিক বর্ণনা ব্যতীত কোনো ঘটনা বর্ণনার আতিশয্য এতে নেই। প্লট-এর বাহুল্য নেই, গ্রাম ও শহরের মধ্যেই গল্পটি ঘোরাফেরা করে। ফটিকের বেড়ে ওঠার গ্রাম্য প্রকৃতি থেকে উৎখাত হয়ে নাগরিক যান্ত্রিকতার মধ্যে এসে পড়ার চরম পরিবর্তন ছাড়া আর তেমন কোনো পরিবর্তন এই গল্পে নেই, শেষেও ফটিকের কী হল তার সুস্পষ্ট ধারণা আমরা পাই না-অতৃপ্তি নিয়েই গল্পটি শেষ হয়। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ছোটোগল্পের বৈশিষ্ট্যগুলি পুনরায় লক্ষ করা প্রয়োজন।

ছোটোগল্পের বৈশিষ্ট্য: পূর্বোক্ত ‘বর্ষা যাপন’ কবিতায় কবিগুরু ছোটোগল্পের আরও একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন-

“ছোটো প্রাণ ছোটো ব্যথা ছোটো ছোটো দুঃখ কথা”

জীবনের চলমান স্রোত থেকে খন্ড খন্ড প্রতীতি আহরণ করবেন গল্পকার। এখানে বিন্দুতে হবে সিধু দর্শন।

(ক) তত্ত্বকথা বা উপদেশ থাকবে না।

(খ) একমুখিতা হবে এই গল্পের বৈশিষ্ট্য।

(গ) বৃহত্তর সত্য, স্বল্পতম ব্যাপ্তির মধ্যে প্রতিফলিত হবে।

(ঘ) “অন্তরে অতৃপ্তি রবে/সাঙ্গ করি মনে হবে।শেষ হয়ে হইল না শেষ”

(ঙ) একটি মাত্র মহামুহূর্ত থাকবে এবং সমগ্র গল্পের উৎকণ্ঠা এর উপর নিবদ্ধ থাকবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘ছুটি’ গল্পটি বিবেচ্য।

ছোটোগল্পরূপে সার্থকতা: গল্পকার আলোচ্য গল্পে ফটিকের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় বন্ধন ও পরে বিচ্ছেদ-এই মূলভাব ও প্রতীতিকে নিয়ে গল্পের কাঠামো গড়ে তুলেছেন। ফলে ছোটোগল্পের একমুখিতার আদর্শ এখানে রক্ষিত হয়েছে। তবে পার্শ্ব উপকরণ হিসেবে গল্পে চিত্রিত হয়েছে ফটিকের কলকাতায় থাকাকালীন জীবনযাপনের কিছু খণ্ড চিত্র। মামির উদাসীনতা ও নিষ্ঠুরতা, স্কুলে মাস্টারমশাইয়ের প্রহার, বই হারিয়ে ফেলা, মামাতো ভাইদের উপেক্ষা ইত্যাদি ফটিকের বেদনাকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে। সমগ্র গল্পে উৎকণ্ঠা দানা বেঁধেছে এই বিশেষ মুহূর্তটিতে- “যে – অকূল সমুদ্রে যাত্রা করিতেছে, বালক রশি ফেলিয়া কোথাও তাহার তল পাইতেছে না।” ফটিকের এই মৃত্যুবর্ণনা গল্পকারের সংযত ভাষানৈপুণ্যের পরিচায়ক। এ ছাড়া দুর্যোগপূর্ণ বর্ষণমুখরিত সেই রাত্রির অশান্ত পরিবেশে ফটিকের মানসিক বিপর্যয়কে গল্পকার ব্যঞ্জনাময় ও আবেদনস্পর্শী করে তুলেছেন।

উপসংহার: ‘ছুটি’ গল্পের মহৎ সত্য হল প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত মানবসত্তা প্রকৃতি থেকে বিচ্যুত হলে, সেই সত্তার অপমৃত্যু ঘটে। তাই গল্পের শেষে কোনো চমক নেই, আছে শাশ্বত জীবনসত্যের ধীর বিশ্বাস। ফলে ‘ছুটি’ গল্পটি যে একটি আদর্শ ছোটোগল্প হিসেবে বিবেচিত হবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

প্রশ্নঃ ৪ রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো। 

উত্তরঃ ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হল- ফটিক। গল্পকার রবীন্দ্রনাথ ছোটোগল্পের ক্ষুদ্র পরিসরে, প্রকৃতির রং তুলি দিয়ে এক কিশোরের মানসিক যন্ত্রণাকে প্রতিবিম্বিত করেছেন।

প্রকৃতির সন্তান: প্রকৃতির কোলে লালিত সন্তান ফটিক কলকাতায় মামা ও মামির আশ্রয়ে এসে প্রথম উপলব্ধি করে, নাগরিক জীবনে সে কতটা অবাঞ্ছিত। ফটিকের গ্রামে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা শুধু মায়ের জন্য নয়, তার অন্তরাত্মার সঙ্গে প্রকৃতির এক নিবিড় একাত্মতার কারণে। শিশুর শিক্ষালাভে যান্ত্রিক পরিবেশ যে প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ, সেই মনোভাবই আশ্চর্য সহানুভূতির সঙ্গে গল্পকার এখানে উন্মোচিত করেছেন।

দলের নেতা: ‘ছুটি’ গল্পের নায়ক ফটিক তার দলবল নিয়ে উন্মুক্ত প্রকৃতির বুকে ছিল স্বচ্ছন্দবিহারী এক কিশোর। ঘুড়ি ওড়ানো, নদীতে সাঁতার কাটা, ‘তাইরে নাইরে নাইরে না’ বলে ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে তার মন আনন্দরসে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত।

সত্যের পূজারি: সত্যের পূজারি ফটিক তার ভাই মাখনলালের গালে চড় মেরে ভাইয়ের মিথ্যাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। কিন্তু অপরদিকে ভ্রাতৃস্নেহে আর্দ্র ফটিক কলকাতা যাত্রার পূর্বে খেলার ঘুড়ি, লাটাই, ছিপ ভাইকে সমর্পণ করে তা সম্পূর্ণ ভোগের অধিকার দিয়ে যায়।

অভিমানী: ফটিক ভীষণ অভিমানী। খেলতে খেলতে পড়ে গিয়ে মাখন যখন তাকে মেরে বাড়ি চলে গিয়েছে, তখন অভিমানে সে আনমনে বসে থেকেছে। মাখনের মিথ্যে অভিযোগে মা যখন তাকে প্রহার করেছে, সেই মুহূর্তে মৃদু প্রতিবাদ করলেও মায়ের উপর তার অভিমান হয়েছে। আপাত মাতৃস্নেহবিহীন গৃহ পরিবেশে উপেক্ষিত ফটিক তাই মামার প্রস্তাবে সহজেই কলকাতা যেতে রাজি হয়ে গিয়েছে। আবার কলকাতা গিয়ে মামির হৃদয়হীন আচরণে অভিমান করে সে বাড়ি ছেড়েছে। এই অভিমান থেকেই ক্রমে প্রাণোচ্ছল ফটিক নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে এবং শেষপর্যন্ত মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হয়েছে।

স্নেহকাতর: ফটিক স্নেহের কাঙাল। গল্পে দেখা যায়, পিতৃহীন ফটিক তার মায়ের স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। সে বোঝে তার মায়ের হৃদয়ের অধিকাংশটাই জুড়ে রয়েছে ভাই মাখন। তাই মামা বিশ্বম্ভরবাবুর সস্নেহ প্রস্তাবে রাজি হয়ে সে কলকাতা চলে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে মামির স্নেহহীন সান্নিধ্য তাকে পীড়িত করে। তাই স্নেহবুভুক্ষু ফটিক শেষপর্যন্ত মামারবাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যায় জর্জরিত: বয়ঃসন্ধিকালীন অবস্থায় নানা ব্যর্থতা কিশোর-কিশোরীদের অন্তরকে পীড়িত করে। ‘ছুটি’ গল্পে ফটিকের প্রতি মামির রূঢ় আচরণ, শিক্ষকের প্রহার, বই হারিয়ে ফেলা, বন্ধুত্বহীন নিঃসঙ্গ জীবন ইত্যাদি ঘটনার ফলে মানসিক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত ফটিকের অন্তরাত্মা। বয়ঃসন্ধিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে বুঝতে না পারার অক্ষমতাই তাকে অবসাদগ্রস্ত করে তুলেছে।

উপসংহার: আসলে রবীন্দ্রনাথ আলোচ্য গল্পে ফটিকের জীবনে আলো ফেলে কিশোর মনের সমস্যার সংকটটিকে যেমন আলোকিত করতে চেয়েছেন, তেমনই দেখিয়েছেন প্রকৃতির সঙ্গে যার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক; প্রকৃতির সঙ্গে বিচ্ছেদে তার বৌদ্ধিক মৃত্যু অনিবার্য। তবে, অনুভূতিশীল ফটিক মুমূর্ষু অবস্থাতেও উপলব্ধি করেছে তার ছুটি হয়েছে। রবীন্দ্রসাহিত্যে ‘ছুটি’-র ফটিক তাই একটি অনন্য চরিত্র হয়ে আজও জীবন্ত হয়ে আছে।

প্রশ্নঃ ৫ রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের মামির চরিত্রটি আলোচনা করো।

উত্তরঃ ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পে বিশ্বম্ভরবাবুর স্ত্রী অর্থাৎ ফটিকের মামি চরিত্রটি কাহিনির করুণ পরিণতির জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গল্পে তাঁর উপস্থিতি খুব বেশি নয়। ফটিক যখন তার অবাধ-অগাধ স্বাধীনতা ছেড়ে মামার সঙ্গে কলকাতা এসেছে, তখনই পাঠক প্রথম পরিচিত হয়েছে এই হৃদয়হীন মামির সঙ্গে। ফটিকের বয়ঃসন্ধিকালীন মর্মব্যথাকে আরও দুঃসহ করে তোলার ক্ষেত্রে এই মামির ভূমিকা অপরিসীম।

বিরূপ মনোভাবাপন্ন: প্রথমেই দেখা গিয়েছে স্বামীর সিদ্ধান্তকে তিনি ভালো মনে গ্রহণ করেননি। বিশ্বম্ভরবাবু ফটিককে নিজদায়িত্বে কলকাতায় নিয়ে এলে ফটিকের মামি তাতে অসন্তুষ্ট হয়েছেন। ফটিকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়েই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, ফটিকের আগমনে তিনি খুশি নন। ফটিককে সাদর সম্ভাষণ জানানো তো দূরের কথা, সামান্য প্রীতি বা সৌহার্দ্য বিনিময় করতেও দেখা যায়নি তাঁকে।

হৃদয়হীন-নিষ্ঠুর আচরণ: গল্পে জানা যায়, তাঁর মামি তিন সন্তানকে নিয়ে নিজের নিয়মে সংসার পরিচালনা করেন। তাই একটি তেরো-চোদ্দো বছর বয়সি অপরিণত, অশিক্ষিত গ্রামের ছেলেকে তাঁর গ্রহণ করতে অসুবিধা হয়েছে। বিশ্বম্ভরবাবুর সিদ্ধান্তকে বাধ্য হয়ে মেনে নিলেও কখনোই ফটিকের সঙ্গে তিনি স্নেহপূর্ণ আচরণ করেননি। বরং তাঁর হৃদয়হীন সান্নিধ্যই ফটিককে ঠেলে দিয়েছে গভীর অবসাদে। মামির কাছে নিজেকে দুর্গ্রহ মনে হয়েছে ফটিকের। শরীর খারাপ হলে মামির সংসারে নিজেকে উপদ্রব বলে মনে করেছে সে। তাই বাড়ি ছেড়েছে ফটিক। ফটিকের বাড়ি ছাড়ার পিছনে মামির এই হৃদয়হীনতা অনেকখানি দায়ী।

মমতাহীন মাতৃত্ব: মামির তিনটি সন্তান থাকলেও ফটিকের প্রতি তাঁর মমত্ব বা মাতৃত্ববোধের লেশমাত্র প্রকট হতে দেখা যায়নি। ফটিক মামির কাছে মাতৃস্নেহে প্রতিপালিত হতে পারত কিন্তু মামির কাছে তার প্রাপ্তি ছিল চরম। অপমান।

প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা এই অসংস্কৃত বালক ফটিকের স্নেহপ্রত্যাশী মনকে মামি অবদমিত করেছেন, তার উৎসাহকেও প্রতিমুহূর্তে দমিয়ে রেখেছেন তিনি। এমনকি, ফটিক অসুস্থ হয়ে পড়লেও মামির মধ্যে। কোনও তৎপরতা লক্ষ করা যায় না। গল্পে ফটিকের মর্মান্তিক পরিণতিতে মামির বড়ো ভূমিকার কথা অনুভূতিশীল পাঠকমাত্রই অনুভব করতে পারেন।

বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যায় অনুঘটক: ফটিকের বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যায় অনুঘটকের কাজ করেছেন মামি। ফটিক তাঁর ননদের ছেলে, সন্তানতুল্য। কিন্তু মামির কাছ থেকে পাওয়া অপমান, উপেক্ষা ও স্নেহবঞ্চনা ফটিকের অন্তরকে পীড়িত করেছে। ফটিকের অসুস্থতায় মামির প্রতিক্রিয়া-“পরের ছেলেকে নিয়ে কেন এ কর্মভোগ।” এই ঘটনাগুলি ফটিকের মনের মধ্যে অপরাধবোধের মাত্রাকে তীব্রতর করেছে। এর পরেই এই মুক্তিপিপাসু বালক চা বিশ্বপ্রকৃতির অনন্ত রহস্যের মধ্যে বিলীন হয়ে গিয়েছে।

উপসংহার: রবীন্দ্রনাথ এমনই এক স্বার্থান্বেষী মামির চরিত্রকে গড়ে তুলেছেন যা ফটিককে তার মর্মান্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে দিয়েছে।

প্রশ্নঃ ৬ রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্প অবলম্বনে বিশ্বম্ভরবাবুর চরিত্রটির পরিচয় দাও। 

উত্তরঃ ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পের প্রধান চরিত্র তথা নায়ক ফটিক চক্রবর্তীর মামা বিশ্বম্ভরবাবু। গল্পের শুরুতেই একটি মজাদার খেলা আবিষ্কার করেও যখন মাখনের দুষ্ট জেদের কারণে খেলা ভঙ্গ হয়ে যায়, তখন ফটিক উদাস হয়ে নদীঘাটে একটি অর্ধনিমগ্ন নৌকার গলুইয়ের উপর বসে থাকে। সেইসময় একটি বিদেশি নৌকায় এক অপরিচিত ব্যক্তির আগমন ঘটে। পরে জানা যায় তিনিই বিশ্বম্ভরবাবু। গল্পকার প্রথমেই জানিয়ে দেন বিশ্বম্ভরবাবু মাঝবয়সি। তাঁর চুলগুলি পাকা হলেও গোঁফ কাঁচা। তিনি নদীঘাটে ফটিকের কাছে চক্রবর্তীদের বাড়ির ঠিকানা জানতে চান এবং ফটিকের ইশারায় সঠিক দিশা না পেয়ে চলে যান। বাড়িতে যখন ফটিক-মাখন-মায়ের বিবাদ তুঙ্গে, ঠিক তখনই সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বিশ্বম্ভরবাবু প্রবেশ করেন এবং বলেন, ‘কী হচ্ছে তোমাদের!’ বিবাদ সেই সময়ের জন্য থামে। জানা যায়, বিশ্বম্ভরবাবু পশ্চিমে কাজ করতে গিয়েছিলেন অনেকদিন। দেশে ফিরে বোনের খবর নিতে এসেছেন।

স্নেহশীল: বিশ্বম্ভরবাবু বোনের প্রতি যেমন ছিলেন স্নেহপরায়ণ তেমনই তিনি সংবেদনশীল এক মানবিক চরিত্র। তিনি পশ্চিমে কর্মে লিপ্ত ছিলেন বলে বোনের পতি বিয়োগের সময় আসতে পারেননি। কিন্তু পরবর্তীকালে স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই স্নেহের আকর্ষণে বোনকে দেখতে আসেন।

কর্তব্যপরায়ণ: বিশ্বম্ভরবাবুর এই আগমনে তাঁর দায়িত্ববোধ তথা কর্তব্যপরায়ণতার দিকটি খেয়াল করা যায়। তিনি বোনের সঙ্গে কথা বলে ভাগনেদের পড়াশোনা এবং মানসিক উন্নতির কথা জানতে চান। ফটিকের উচ্ছৃঙ্খলতা ও পড়াশোনায় অমনোযোগের কথা শুনে এবং বিধবা বোনের অসহায়তা বুঝে ফটিককে কলকাতায় নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন।

অৰিৰেচক: ফটিক কলকাতার নাগরিক পরিবেশে থাকাকালীন যে দুঃসহ ব্যথা অন্তরে বহন করেছিল, তার শরিক হতে পারেননি বিশ্বম্ভরবাবু। স্নেহ, মায়া, মমতা ও সহানুভূতির বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ফটিকের জন্য তিনি তার সহৃদয়তারও কোনো পরিচয় দেননি। এমনকি ফটিকের মামির নিষ্ঠুর আচরণের প্রতিবাদ না করে তিনি নীরব দর্শক হয়েই থেকেছেন।

বাস্তবজ্ঞানহীন: বিশ্বম্ভরবাবু ছিলেন এক বাস্তববোধহীন মানুষ। কারণ তাঁর নিজের তিনটি সন্তান থাকা সত্ত্বেও ভাগনে ফটিকের শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্ব নিয়ে তিনি সংসারে এক মহাসংকট ডেকে আনেন। বিশ্বম্ভরবাবুর বাস্তবজ্ঞানহীনতার জন্যই কার্যত সহজসরল, মুক্ত প্রকৃতির লালিত সন্তান ফটিককে জীবনাহুতি দিতে হয়েছে।

মানবদরদি: গল্পের শেষে বিশ্বম্ভরবাবুকে আবার মানবিক হতে দেখা যায়। ফটিক বাড়ি থেকে পলায়ন করলে তিনি পুলিশকে খবর দেন। অসুস্থ অবস্থায় পুলিশ ফটিককে ধরে আনলে তিনি তাকে কোলে করে অন্তঃপুরে নিয়ে যান। ফটিকের জ্বর বাড়লে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে ডাক্তার ডাকেন এবং ফটিকের মাকে আনতে পাঠান। গল্পে তিনি যেটুকু উপস্থিত থেকেছেন, তাতে তাঁর কর্তব্যপরায়ণতা, স্নেহশীলতা যেমন প্রকাশিত হয়েছে তেমনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর মানবিক হৃদয়বৃত্তিগুলিও।

উপসংহার: সবশেষে বলা যায় যে, ফটিকের মামা বিশ্বম্ভরবাবুর চরিত্রটি যাবতীয় মানবিক গুণসম্পন্ন হয়েও ফটিকের জীবনকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে এক ব্যর্থ কারিগররূপেই চিত্রিত হয়েছে।

প্রশ্নঃ ৭ রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পে চিত্রিত ফটিকের মায়ের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

অথবা, “ছুটি গল্পের ফটিকের মায়ের চরিত্রটি জৈবিক মাতৃত্ব এবং রহস্যময় নারীমনের জীবন্ত প্রকাশ”-মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তরঃ ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ছুটি’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফটিকের গড়ে ওঠা ও করুণ পরিণতির নেপথ্যে গরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার মায়ের চরিত্রটি। এই গল্পে মা খুব স্বল্পপরিসরজুড়ে থাকলেও ফটিক চরিত্রটিকে অবলম্বন করে গল্পের সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছেন। ফটিকের কলকাতা যাত্রার পূর্বে ও পরবর্তীতে মায়ের চরিত্রটিকে দু-বার এই গল্পে আবিষ্কার করা যায়। যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ ‘ছুটি’ গল্পে ‘ফটিকের মা’ চরিত্রটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, সেগুলি নিম্নরূপ-

আত্মনির্ভরশীল: ফটিকের মা একজন বিধবা একাকী রমণী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে দুই ছেলে, মাখন ও ফটিককে একার প্রচেষ্টায় বড়ো করতে দেখা গিয়েছে। লক্ষণীয়, তিনি কিন্তু কারোর সাহায্যপ্রার্থী হননি। দীর্ঘদিন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন দাদা বিশ্বম্ভর হঠাৎই বোনের বাড়ি এসে উপস্থিত হলে বোনের দুরবস্থার কথা জানতে পারেন। বিধবা মা আত্মনির্ভরশীলতার জোরেই দুই সন্তানকে একা সামলেছেন।

সন্তানদের ভবিষ্যৎচিন্তায় সদাতৎপর: ফটিকের মা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সর্বদা সচেতন ছিলেন। তিনি দুই ছেলেকেই লেখাপড়া শেখাতে আগ্রহী। দাদা বিশ্বম্ভরের কাছে তিনি কনিষ্ঠ পুত্র মাখনলালের বিদ্যানুরাগ নিয়ে প্রশংসা করেন। ফটিকের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত ও নিরাপদ করতেই একবাক্যে তাকে কলকাতায় পাঠাতে রাজি হয়ে যান। সন্তানদের শুভকামনায় সর্বদা তাঁকে বিচলিত হতে দেখা গিয়েছে।

কঠিনে-কোমলে: দুই সন্তান এবং সর্বোপরি ফটিকের মতো দুরন্ত এক ছেলেকে সামলাতে গিয়ে মাকে প্রয়োজনে কঠোর হতে ও শাসন করতে দেখা গিয়েছে। মাখনের কথায় বিশ্বাস করে ফটিককে প্রহার করার বিষয়টি আপাতভাবে তাঁর নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী রূপ বলে মনে হলেও তাঁর অপত্যস্নেহের দিকটিও বিচার্য। ফটিকের দৌরাত্ম্যে তিনি অতিষ্ঠ হয়ে তাকে প্রহার করেন, কারণ সেই মুহূর্তে ফটিককে শাসন করাই তাঁর উচিত বলে মনে হয়েছিল। আবার, ফটিক মামার কথায় কলকাতা যাত্রার ব্যাপারে সহজেই স্বীকৃত হলে মাকে মনঃক্ষুণ্ণ হতেও দেখা যায়।

‘ফটিকের মা’: গল্পে মা চরিত্রটিকে মাখনের প্রতি অতিরিক্ত যত্নশীল ও ফটিকের প্রতি রুষ্ট হতে দেখা গেলেও গল্পে রবীন্দ্রনাথ এই চরিত্রটিকে আদ্যন্ত ‘ফটিকের মা’ বলেই নির্দেশ করেছেন। দুরন্ত ছেলেটির প্রতি মায়ের পরোক্ষ অথচ অধিকতর উদ্বেগকেই এখানে দেখাতে চেয়েছেন গল্পকার। মাখনকে কোনোদিন ফটিক জলে ফেলে দিতে পারে বা গুরুতরভাবে আঘাত করতে পারে- এই বিষয়ে ‘ফটিকের মা’-র আশঙ্কা থাকায় তিনি দাদা বিশ্বম্ভরের সঙ্গে তাকে কলকাতা পাঠিয়ে দিতে চান। উল্লেখ্য, দাদা বিশ্বম্ভরকে তিনি যথেষ্ট ভরসা করতেন, তাই সুরক্ষিত হাতেই তিনি ফটিককে অর্পণ করেছেন। ফটিকের শুভচিন্তা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বার্থেই তাকে দূরে পাঠাতে কুণ্ঠিত হয়নি এই মাতৃহৃদয়, তথাপি ফটিক একবাক্যে শহরে যেতে রাজি হয়ে গেলে তিনি কষ্টই পান। অর্থাৎ ছেলে, মায়ের কাছে থেকে যাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ না করে স্বেচ্ছায় তার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাইছে-যা এই স্নেহময়ী মা সহজে মেনে নিতে পারেননি।

আবার দেখা যায়, রোগশয্যায় ফটিক মায়ের কাছেই যেতে চেয়েছে, বয়ঃসন্ধির টানাপোড়েনেও তার মা-ই হতে পারতেন আশ্রয়। অর্থাৎ নাগরিক জীবন থেকে মাকেই মুক্তির অবলম্বন করতে চেয়েছে সে এবং শেষেও মাকেই সে বলে-“মা, আমার ছুটি হয়েছে মা” অর্থাৎ মা-ই ফটিক ও প্রকৃতির এক যোগসূত্র হয়ে উঠেছে। অবাধ্য, দুষ্ট সন্তানটিকে আপাতচক্ষে মায়ের উপদ্রব বলে মনে হলেও সে-ই মায়ের অন্তরের সবচেয়ে কাছের ধন। আর মায়ের এই ভালোবাসা ঘোষিত হয়েছে ‘ফটিকের মা’ সম্বোধনের মধ্য দিয়েই।

উপসংহার: উল্লেখ্য, ফটিক নগরে চলে গেলে মায়ের জন্য তার মন বারবার কেঁদে ওঠার কথা গল্পে আছে কিন্তু একই সময়ে মায়ের মনোভাব গল্পে ব্যক্ত হয়নি। কেবল গল্পের শেষপ্রান্তে এসে ফটিকের অসুস্থতার খবর শুনে শোকাতুর হয়ে তাঁর আগমনের ছবিটুকুই পাওয়া যায়। ফটিক তাঁর ছুটি হওয়ার তথা মুক্তি পাওয়ার ভাবটি মাকেই প্রথম বলে, অর্থাৎ মা ও ফটিকের হৃদয়ের যোগ ছিলই, কিন্তু ফটিক চরিত্রটিকে স্পষ্ট করে তুলতে মায়ের চরিত্রটি আড়ালেই থেকে গিয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ফটিকের মা-এর আপাতকঠোর, নিষ্ঠুর, অত্যাচারী প্রতিকৃতির আড়ালে একজন স্নেহময়ী, শুভাকাঙ্ক্ষী, কর্তব্যপরায়ণ, সন্তানের চিন্তায় মগ্ন মাকেই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

✏️

এই Post টো Update কৰাত সহায় কৰিব বিচাৰে নেকি?

ইয়াত কিবা ভুল, অসম্পূৰ্ণ তথ্য বা নতুন তথ্য থাকিলে আপুনি এটা উন্নত version প্ৰস্তুত কৰিব পাৰে। Live Post তৎক্ষণাৎ সলনি নহ'ব।

Update This Post

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top