West Bengal Class 12 4th Semester Bangla Chapter 11 Solution | প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য় অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা | পশ্চিমঙ্গ দ্বাদশ শ্রেণী চতুৰ্থ সেমিস্টার বাংলা চ্যাপ্টার ১১ অধ্যায়ের সমাধান |

প্ৰদত্ত সূত্ৰ ও তথ্য় অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা

Chapter-11

1. প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো 

জন্মঃ ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ, ১২ জানুয়ারি, কলকাতার সিমলায়।

পিতাঃ বিখ্যাত আইনজীবী বিশ্বনাথ দত্ত।

মাতা: ভুবনেশ্বরী দেবী।

শিক্ষাজীবন: মেট্রোপলিটান স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় এবং স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।

রামকুরের সান্নিধ্য ও দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে এসে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে রামকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর বরানগরে রামকৃষ্ণ মঠ স্থাপন।

কর্মজীবন: ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে শিকাগো ধর্মমহাসভায় যোগদানের জন্য আমেরিকা যাত্রা। ইংল্যান্ড ভ্রমণ, ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন। রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠা।

উল্লেখযোগ্য রচনা: ‘পরিব্রাজক’, ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য” বর্তমান ভারত’।

মৃত্যু: ১৯০২ খ্রিস্টাব্দ, ৪ জুলাই।

স্বামী বিবেকানন্দ

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়ঃ স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ জানুয়ারি কলকাতার সিমলা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তাঁর নাম হয় স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর পিতা ছিলেন বিখ্যাত আইনজীবী বিশ্বনাথ দত্ত। মায়ের নাম ভুবনেশ্বরী দেবী। শৈশবে বিবেকানন্দ বীরেশ্বর বা বিলে নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন।

শিক্ষাজীবন: শৈশব থেকেই বিবেকানন্দ তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রখর বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি মেট্রোপলিটান স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন। এরপর তিনি ভরতি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। কিন্তু কিছুদিন পর সেই কলেজ ছেড়ে দিয়ে তিনি চলে আসেন স্কটিশচার্চ কলেজে এবং সেখান থেকে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি আইন পড়তেও শুরু করেছিলেন। তবে তাঁর পিতার আকস্মিক মৃত্যু হওয়ায় পরিবারে আর্থিক অনটন দেখা দেয়। ফলে আইন পড়া সমাপ্ত করতে পারেননি তিনি।

রামকুরদেবের সান্নিধ্যঃ জীবনের একটি কঠিন ও জটিল সময়ে এসে তিনি রামকৃষ্ণদেবের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁকে গুরু হিসেবে বরণ করে নেন বিবেকানন্দ। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে রামকৃষ্ণদেবের দেহত্যাগের পর বিবেকানন্দ তাঁর গুরুভাইদের সহায়তায় বরানগরে রামকৃষ্ণ মঠ স্থাপন করেন।

কর্মজীবন : ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি নিজের দেশ এবং দেশবাসীকে নিবিড়ভাবে জানা-বোঝার উদ্দেশ্যে ভারতভ্রমণে বের হন। উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত পায়ে হেঁটে ঘুরলেন। সাধারণ নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে মিশে দেশের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে থাকেন তিনি। পাশাপাশি চলতে থাকে বিভিন্ন শাস্ত্র-পাঠ। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্মসভায় যোগ দেওয়ার জন্য আমেরিকায় যাত্রা করেন। ১১ সেপ্টেম্বর সেখানে হিন্দুধর্ম নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে তিনি বিদেশিদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এরপর ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে তাদের চোখে ভারতবাসীর সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা ছিল, তা দূর করার চেষ্টা করেন এবং সফলও হয়েছিলেন। দ্রুত তাঁর জনপ্রিয়তা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করা তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তাঁর ত্যাগ ও সমাজসেবার ব্রত দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মিস মার্গারেট নোবেল তাঁর আদর্শে উদ্‌বুদ্ধ হয়ে এই দেশে আসেন এবং দরিদ্র ভারতবাসীর সেবায় আত্মনিযুক্ত হন। তাঁর নাম হয় ভগিনী নিবেদিতা।

উল্লেখযোগ্য রচনা: স্বামী বিবেকানন্দ লেখক হিসেবেও নিজস্ব কৃতিত্বের ছাপ রেখে গেছেন। ইংরেজি ও বাংলায় তিনি বেশ কিছু গ্রন্থের প্রণেতা। ‘পরিব্রাজক’, ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’, ‘বর্তমান ভারত’, ‘ভাববার কথা’ ইত্যাদি গ্রন্থে তিনি ভ্রমণ থেকে শুরু করে ধর্ম সব কিছুরই আস্বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। তিনি গদ্য লেখার ক্ষেত্রে বাংলার চলিত ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন চিরকাল। তাই তাঁর রচনা অত্যন্ত সুখপাঠ্য।

মৃত্য়ুঃ ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে এই মহাপুরুষের প্রয়াণ ঘটে। ভারতবর্ষের নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ বিবেকানন্দ। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমগ্র মানব জাতিকে ত্রাণ করাই যেন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল। সেই কাজে তিনি যে অনেকাংশেই সফল, তা বলাই বাহুল্য।

2. প্রদন্ত্র সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো।

জন্মঃ ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯১৮, দিনাজপুর

পিতাঃ প্রমথনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

শিক্ষা: দিনাজপুর জেলা স্কুল, ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিএ পাস (১৯৩৮), কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ (বাংলা) এবং ডিফিল (১৯৬০)।

কর্মজীবন: জলপাইগুড়ি কলেজ, সিটি কলেজ (কলকাতা) এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা।

সাহিত্যকীর্তিঃ ‘উপনিবেশ’, ‘শিলালিপি’, ‘পদসঞ্চার’, ‘লালমাটি’, ‘চারমূর্তি’, ‘পটলডাঙার টেনিদা’, ‘সুনন্দর জার্নাল’ প্রভৃতি।

মৃত্যুঃ ৬ নভেম্বর ১৯৭০, কলকাতা।

উত্তরঃ

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়ঃ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১৮খ্রিস্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি, অধুনা বাংলাদেশের অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার বালিয়াডাঙ্গীতে। তাঁর পিতার নাম প্রমথনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন পুলিশের একজন বড়ো কর্তা।

শিক্ষাজীবন: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের পড়াশোনার সূত্রপাত দিনাজপুর জেলা স্কুলে। এরপর ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ভরতি হন তিনি। পরবর্তীতে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন তিনি। কৃতী এই ছাত্র প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিফিল ডিগ্রিও প্রাপ্ত হন ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে।

কর্মজীবন: সারাজীবন সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি অধ্যাপনা করেছেন। প্রথমে পড়াতেন জলপাইগুড়ি কলেজে। তারপর কলকাতার সিটি কলেজে পড়িয়ে শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।

সাহিত্যকীর্তিঃ খুব ছোটো থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত হয় ‘মাস পয়লা’ শিশু মাসিকে। ছোটোদের জন্য ‘সন্দেশ’, ‘শুকতারা’, ‘মুকুল’, ‘পাঠশালা’ প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত ছাপা হয়। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় তাঁর লেখা ‘সুনন্দর জার্নাল’ প্রকাশিত হয়, যা তাঁকে প্রবল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। বাঙালির সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সার্বিক জীবনযাত্রা নিয়ে এই জার্নাল লেখেন তিনি। বড়োদের জন্য এই সময়ে গল্প উপন্যাস লিখতে থাকেন ‘আনন্দবাজার’, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘বিচিত্রা’, ‘চতুরঙ্গ’ ইত্যাদি পত্রিকায়। তাঁর প্রথম উপন্যাস (বড়োদের জন্য) ‘উপনিবেশ’ প্রকাশিত হয় মাসিক ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায়। তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে।

বড়োদের জন্য লিখে খ্যাতি পেলেও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সিদ্ধি মূলত শিশু-কিশোর সাহিত্য সৃষ্টির জন্য। ‘টেনিদা’ চরিত্র সৃষ্টি তাঁকে বাংলা কিশোর সাহিত্যে অমর করেছে। তাঁর রচিত ‘পদ্মপাতার দিন’, ‘কম্বল নিরুদ্দেশ’, ‘চারমূর্তির অভিযান’, ‘ঝাউবাংলার রহস্য’, ‘পঞ্চাননের হাতি’, ‘ক্যাম্বের আকাশ’, ‘লালমাটি’, ‘রাঘবের জয়যাত্রা’, ‘তারা ফোটার সময়’, ‘খুশির হাওয়া’, ‘অধকারের আগন্তুক’, ‘জয়ধ্বজের জয়রথ’, ‘অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ’, ‘বাংলা গল্প বিচিত্রা’, ‘ঘন্টাদার কাবলু কাকা’ ও ‘ছোটোদের শ্রেষ্ঠ গল্প’ বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগতে উজ্জ্বল সংরক্ষণ।

বড়োদের জন্য যে উপন্যাসগুলি লিখেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়গুলি হল-উপনিবেশ-প্রথম খন্ড, উপনিবেশ-দ্বিতীয় খণ্ড, উপনিবেশ-তৃতীয় খণ্ড, উপনিবেশ-চতুর্থ খণ্ড, সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী, ট্রফি, মন্ত্রামুখর, লালমাটি, মহানন্দা, কৃষ্ণপক্ষ, স্বর্ণসীতা, বৈতালিক, অসিধারা, শিলালিপি, আমাবস্যার গান, আলোকপর্ণা, ভাটিয়ালি, পদসম্ভার, বনশ্রী ইত্যাদি। তাঁর রচিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটকগুলি হল- ‘রামমোহন’ ‘ভাড়াটে চাই’, ‘পরের উপকার করিও না’, ‘ভীম বোধ’ প্রভৃতি। ছোটগল্পের সংকলনগুলির মধ্যে ‘বীতৎস’, ‘দুঃশাসন’, ‘ভোগবতী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ‘সাহিত্যে ছোটোগল্প’ নামক একটি গবেষণা গ্রন্থও রচনা করেন।

মৃত্যঃ ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ৮ নভেম্বর মাত্র ৫২ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন।

3. প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো।

জন্মঃ ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮২০ বীরসিংহ গ্রাম (তদানীন্তন হুগলি জেলা)।

মাতা-পিতা: ভগবতী দেবী, ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।

শিক্ষাজীবন: পাঠশালা, পরে কলিকাতা রাষ্ট্রীয় সংস্কৃত মহাবিদ্যালয়। ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ। সংস্কৃত ভাষাশ্রিত বিদ্যার পরে ইংরেজি ভাষাশ্রিত বিদ্যায় শিক্ষাগ্রহণ।

কর্মজীবন: সংস্কৃত কলেজ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, সংস্কৃত কলেজ। ফোর্ট উইলিয়ামে বাংলা ভাষার পণ্ডিত, সংস্কৃত কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক, পরে অধ্যক্ষ। ১৮৫৭-এর নভেম্বর থেকে অন্তত ৩৫টি স্কুল স্থাপন।

সমাজসংন্ত্রারঃ বালবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ আন্দোলন। স্ত্রীশিক্ষার প্রসার ও বিধবাবিবাহ প্রচলন।

সাহিত্যকৃতিঃ বাংলা গদ্যের আধুনিক রূপদানের তিনি ‘সেনাপতি’। বর্ণপরিচয়, বোধোদয়, কথামালা, আখ্যানমঞ্জুরী প্রভৃতি গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি অনুবাদ গ্রন্থ-বেতাল পঞ্চবিংশতি, শকুন্তলা, সীতার বনবাস, ভ্রান্তিবিলাস ইত্যাদি।

মৃত্যু: ২৯ জুলাই, ১৮৯১। [HS-20]

উত্তরঃ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়ঃ ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা তথা ভারতবর্ষে বিদ্যাসাগর নামেই সর্বজনবিদিত। তিনি ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার (তদানীন্তন হুগলি জেলা) বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতার নাম ভগবতী দেবী।

শিক্ষাজীবন: বিদ্যাসাগর শৈশব থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। সেইসঙ্গে ছিল প্রখর স্মৃতিশক্তি। গ্রামের পাঠশালায় তাঁর পঠনপাঠনের সূত্রপাত হয়। মাত্র আট বছর বয়সে পিতার সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। নয় বছর বয়সে তিনি সংস্কৃত মহাবিদ্যালয়ে ভরতি হন। টানা বারো বছর সেখানে শিক্ষা গ্রহণ করেন। সংস্কৃত কলেজে সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য, বেদান্ত, ন্যায়-দর্শন, স্মৃতি, জ্যোতিষ এবং পরবর্তীতে ইংরেজি ভাষা তিনি অনায়াসে আয়ত্ব করেন। পান্ডিত্যের জন্য তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

কর্মজীবনঃ বাংলার নবজাগরণ বা রেনেসাঁর অন্যতম প্রাণপুরুষ হলেন বিদ্যাসাগর। তিনি প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ভাষার পণ্ডিত হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সংস্কৃত কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কালক্রমে তিনিই সেই কলেজের অধ্যক্ষের পদ অলংকৃত করেন। এ ছাড়াও ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলায় মোট ৩৫-টি স্কুল স্থাপিত করেন।

সমাজসংস্কার: বিদ্যাসাগর ছিলেন বলিষ্ঠ চরিত্র এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সেইসঙ্গে প্রগতিশীল ও পরিণতমনস্ক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের কিছু কু-প্রথা দূর করা না গেলে সমাজের সার্বিক মঙ্গল সাধিত হবে না। তাই তিনি আজীবন সেইসব মানবতা-বিরোধী কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গিয়েছেন। বহুবিবাহ এবং বাল্যবিবাহের মতো ঘৃণ্য প্রথা তিনি রদ করান। শুধু তাই নয়, সমাজে বিধবাদের দুরবস্থা লক্ষ করে তিনি বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করেন। তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ প্রবলভাবে তাঁর বিরোধিতা করেছিল। বিদ্যাসাগর নিন্দিত হলেও আপন লক্ষে অবিচল ছিলেন। বিভিন্ন শাস্ত্রের থেকে উদ্ধৃতি তুলে এনে বিধবাদের বিবাহকে আইনসংগতভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।

সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ হল নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো। মেয়েদের পড়ার জন্য তিনি বেশ কিছু বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পুরনো রীতি পরিবর্তন করে নতুনভাবে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় শিক্ষার রীতি তিনিই প্রবর্তন করেন। কলকাতার ‘মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন’ তাঁর আর এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ‘বিদ্যাসাগর কলেজ’ নামে পরিচিত।

সাহিত্যসৃষ্টিঃ বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের জনক। তাঁর হাত ধরেই বাংলা গদ্যভাষা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও মধুর হয়ে ওঠে। তিনিই প্রথম যতিচিহ্ন ব্যবহার করে বাংলা গদ্যকে একটি সুশৃঙ্খল সৌন্দর্য দান করেন। সংস্কৃত, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষা থেকে বেশ কিছু গ্রন্থ বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন। তাঁর পাণ্ডিতা এবং রসসৃষ্টির কারণে এই অনুবাদগুলিও মৌলিক গ্রন্থের মতোই মর্যাদা পায়। অনুবাদ গ্রন্থগুলি হল- ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি, ‘সীতার বনবাস’, ‘শকুন্তলা’, ভ্রান্তিবিলাস ইত্যাদি। শিশু-শিক্ষার জন্য তিনি লেখেন- ‘বর্ণপরিচয়’, ‘কথামালা’ ‘আখ্যানমঞ্জুরি’ ইত্যাদি।

উপসংহারঃ ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বাল্যকাল থেকেই ছিলেন অত্যন্ত দয়াবান। দুর্গত বহু মানুষকে তিনি সাহায্য করেছেন। কারও পড়ার খরচ দিয়ে কিংবা বিধবার বিয়েতে আর্থিক সহায়তা করে তিনি সাধারণ মানুষের জন্য সর্বদা ভেবেছেন। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই এই মহৎ ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ ঘটে।

4. প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো।

জন্মঃ ১০ মার্চ ১৯৪২ গয়েরকাটা, জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ।

পিতাঃ কৃষ্ণদাস মজুমদার।

মাতাঃ শ্যামলী দেবী।

শৈশব: ডুয়ার্স অঞ্চলে।

শিক্ষাঃ ভবানী মাস্টারের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাস, কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্নাতক, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন।

কর্মজীবন: ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকার প্রকাশনা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত, প্রথম গল্প ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ‘অন্যমাত্রা’ ১৯৬৭খ্রিস্টাব্দে, ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’। অন্যান্য উপন্যাসগুলির মধ্যে প্রধান হল-‘সাতকাহন’, ‘উজান গঙ্গা’, ‘১৩পার্বণ’, ‘স্বপ্নের বাজার’, ‘ভিক্টোরিয়ার বাগান’, ‘আটকুঠুরি নয় দরজা’। তাঁর ট্রিলজি-‘উত্তরাধিকার’, ‘কালবেলা’, ‘কালপুরুষ’।

পুরম্ভার ও সম্মাননা: ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে আনন্দ পুরস্কার, ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, এ ছাড়াও বঙ্কিম পুরস্কার, IIMS পুরস্কার, BFJ পুরস্কার প্রভৃতি।

মৃত্যুঃ COPD-তে ভুগছিলেন, মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ জনিত কারণে ৮ মে, ২০২৩-এ পরলোক গমন। [HS-23]

উত্তরঃ

সমরেশ মজুমদার

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়: জলপাইগুড়ি জেলার গয়েরকাটা চা- বাগানে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ সমরেশ মজুমদারের জন্ম। তাঁর পিতার নাম কৃষ্ণদাস মজুমদার, মায়ের নাম শ্যামলী দেবী। ডুয়ার্সের মনোরম পরিবেশে তাঁর শৈশব কেটেছিল, যার প্রভাব তাঁর কথাসাহিত্যেও দেখতে পাওয়া যায়। সমরেশ মজুমদারের প্রাথমিক শিক্ষার সূত্রপাত ভবানী মাস্টারের পাঠশালায়। এরপর জলপাইগুড়ি শহরে এসে তিনি জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলে ভরতি হন। জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। ভরতি হন স্কটিশ চার্চ কলেজে। সেখান থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতক হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় পাশ করেন তিনি।

কর্মজীবন: আনন্দবাজার পত্রিকার গোষ্ঠীতে তিনি দীর্ঘদিন চাকরি

করেছেন। এ ছাড়াও গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নাটক লিখে সাহিত্য জীবন শুরু হলেও খুব দ্রুত চলে আসেন ছোটোগল্প ও উপন্যাস সৃষ্টির জগতে। জনপ্রিয়তাও আসে কথাসাহিত্যের হাত ধরেই। তাঁর লেখা প্রথম গল্প ‘অন্যমাত্রা’ প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকায় ১৯৬৭খ্রিস্টাব্দে। প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’-ও দেশ পত্রিকাতেই ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ছাপা হয়। তারপর আর তাঁকে পিছন ফিরে দেখতে হয়নি। লিখে গেছেন একের পর এক গল্প, উপন্যাস, কিশোর সাহিত্য; এবং পাঠকের ভালোবাসায় স্নাত হয়েছেন আজীবন।

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য: তাঁর উপন্যাস, সংখ্যায় বিপুল হলেও প্রতিটির কাহিনিতে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তাঁর লেখনী সুখপাঠ্য এবং টানটান। সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সমরেশ মজুমদারের লেখাকে এক ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। কথনভলী, সংলাপ, প্লট সৃষ্টি- সবেতেই তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

সমরেশ মজুমদারের আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘উত্তরাধিকার’ পাঠক মহলে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীতে তিনি এই উপন্যাসের আরও চারটি খণ্ড লেখেন। দ্বিতীয় খণ্ড ‘কালবেলা’ নকশাল আমলের প্রেক্ষাপটে রচিত। তাঁর সবচেয়ে সফল এবং সর্বাধিক বিক্রীত উপন্যাসের অন্যতম এই ‘কালবেলা’। পরের দুটি খণ্ড ‘কালপুরুষ’ ও ‘মৌষলকাল’-ও জনপ্রিয়তার ধারা বজায় রাখে। নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা ‘সাতকাহন’ উপন্যাসটির আবেদন উপন্যাসপ্রেমী পাঠকদের কাছে আজও অমলিন। এ ছাড়াও তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত উপন্যাসগুলি হল-‘১৩ পার্বণ’, ‘গর্ভধারিণী’, ‘ভিক্টোরিয়ার বাগান’, ‘উজান গঙ্গা’, ‘আট কুঠুরি নয় দরজা’, ‘ছায়া পূর্বগামিনী’, ‘স্বপ্নের বাজার’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘বুনোহাঁসের পালক’, ‘অগ্নিরথ’, ‘দিন যায় রাত যায়’, ‘হরিণবাড়ি’, ‘কলিকাতায় নবকুমার’ ইত্যাদি। ‘এক জীবনে অনেক জীবন’ নামে তিনি আত্মজীবনী লেখেন যা তাঁর ভক্তদের কাছে অবশ্যপাঠ্য একটি গ্রন্থ। শুধু তাঁর জীবন নয়, এই বইটি পড়লে তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন খুঁটিনাটি জানা যায়। কিশোরদের জন্য সৃষ্ট সত্যসন্ধানী অর্জুন চরিত্রটিও ছোটো-বড়ো নির্বিশেষে সব বয়সীদের কাছেই অত্যন্ত প্রিয়।

পুরস্কার ও সম্মাননাঃ সমরেশ মজুমদার সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার লাভ করেছিলেন। চিত্রনাট্য রচনার জন্যও তিনি বিএফজে পুরস্কার পান।

মৃত্যুঃ অত্যধিক ধুমপান করার জন্য শেষ জীবনে সিওপিডি রোগে ভুগছিলেন তিনি। এ ছাড়া স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগও ছিল, যে রোগের কারণে ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে তিনি প্রয়াত হন।

5. প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো:

জন্মঃ ২৫ নভেম্বর ১৯২৫, শিবপুর, হাওড়া, বেঙ্গাল, ব্রিটিশ ভারত।

পরিবার: পিতা হেমচন্দ্র দেবনাথ এবং মাতা রমণসোনা দেবী। তিন ভাইবোনের মধ্যে বড়ো ছেলে নারায়ণ। পরিবারের স্বর্ণের ব্যাবসা। কিন্তু নারায়ণ দেবনাথের সেদিকে ঝোঁক ছিল না।

শৈশব ও বাল্যশিক্ষা: ছোটোবেলা থেকেই তাঁর ঝোঁক চিত্রকলা শিল্পের প্রতি। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে ফাইন আর্টস নিয়ে পড়াশোনা। কিন্তু ডিগ্রি শেষ না করেই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া শিল্পের নেশায় মগ্ন হওয়া।

কর্মজীবন ও সাহিত্যঃ পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ায় বিভিন্ন বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে লোগো তৈরি এবং সিনেমার স্লাইড তৈরির কাজ-এর ফাঁকেই শুরু করেন অনুবাদমূলক লেখা। কালিদাসের লেখা ত্রিবেণীর বাংলা অলংকরণ-এর পরেই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি শুরু করে দেন ‘শুকতারা’-র অলংকরণ এবং প্রচ্ছদের কাজ। ১৯৫০-এর মাঝামাঝি ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকার ‘আনন্দমেলা’-তে কাজ শুরু ১৯৬২-তে হাঁদা ভোঁদার কমিক্স সৃষ্টি, ১৯৬৫-তে তৈরি করলেন রঙিন ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করেন ‘নন্টে ফন্টে’। তারপর ‘কিশোর ভারতী’-তে তৈরি করেন ‘ম্যাজিশিয়ান পটলচাঁদ’ কমিক্স।

মূল্যায়ন: নারায়ণ দেবনাথ সম্পর্কে শান্তনু ঘোষ বলেন, “নারায়ণবাবুর কাছে কমিক আঁকা ছিল একটা নয়টা পাঁচটা চাকরি করার মতো। তিনি এটাকে কখনোই খুব মহান কোনো অর্জন হিসেবে দেখেননি, যেটির কোনো প্রামাণ্য দলিল বা সম্মানের প্রয়োজন। প্রাপ্য স্বীকৃতিটা তার জীবনে অনেক দেরি করে এসেছে। কিন্তু তাই বলে তিনি কখনও নিজের রাস্তা থেকে সরে গিয়ে সেসবের পিছনে ছোটেননি। বিখ্যাত কমিক চরিত্র হাঁদা ভোঁদা (১৯৬২), বাটুল দি গ্রেট (১৯৬৫), নন্টে ফন্টে (১৯৬৯), ব্ল‍্যাক ডায়মন্ড, ইন্দ্রজিৎ রায়, ডিটেকটিভ কৌশিক রায়, বাহাদুর বেড়াল, শুটকি আর মুটকি, পেটুক মাস্টার বটুকলাল, পটলচাঁদ দ্য ম্যাজিশিয়ান।

পুরস্কার ও সম্মাননা: বঙ্গভূষণ (২০১৩), সাহিত্য আকাদেমি (২০১৩), পদ্মশ্রী (২০২১)। একমাত্র তিনিই ভারতীয় কার্টুনিস্ট হিসেবে ডিলিট উপাধি পান।

মৃত্যু: ২০২১-এর ২৪ ডিসেম্বর হৃদরোগের কারণে হাসপাতালে ভরতি। ১৮ জানুয়ারি ২০২২-এ তিনি প্রয়াত হন।

উত্তর:

নারায়ণ দেবনাথ

জন্ম, পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা: নারায়ণ দেবনাথের জন্ম পরাধীন ভারতবর্ষের হাওড়া জেলার শিবপুরে, ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ নভেম্বর। তাঁর পিতার নাম হেমচন্দ্র দেবনাথ এবং মাতার নাম রমণসোনা দেবী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়ো ছেলে। তাঁদের পারিবারিক ব্যাবসা ছিল স্বর্ণের। অর্থাৎ ছোটো থেকেই সচ্ছল পরিবারে মানুষ তিনি। কিন্তু ব্যাবসার দিকে তাঁর আদৌ কোনো ঝোঁক ছিল না। ছোটো থেকেই চিত্রকলা শিল্পের প্রতি তাঁর অদম্য ভালোবাসা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে ভরতি হন। তবে ডিগ্রি সমাপ্ত করেননি। শিল্পের নেশায় মগ্ন হয়ে তিনি নিজস্ব সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন।

সাহিত্য ও কর্মজীবন: পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পর প্রথমে তিনি বিভিন্ন বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে লোগো আঁকতে শুরু করেন। পাশাপাশি চলতে থাকে সিনেমার স্লাইড তৈরির কাজ। এসবের মধ্যেই তিনি মহাকবি কালিদাসের লেখা ত্রিবেণীর বাংলা অনুবাদে অলংকরণ করতে শুরু করেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে তিনি যোগ দেন ‘শুকতারা’ পত্রিকায়। সেখানে অলংকরণ ও প্রচ্ছদের কাজ সাফল্যের সঙ্গে করতে করতেই ১৯৫০-এর মাঝামাঝি ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকার জন্যও আঁকতে থাকেন তিনি।

নারায়ণ দেবনাথ সৃষ্ট প্রথম কমিকস ‘হাঁদা ভোঁদা’। দেব সাহিত্য কুটীরের সম্পাদক মন্ডলীর উৎসাহে তিনি কমিকস রচনায় হাত দেন। উল্লেখ্য, ‘হাঁদা ভোঁদা’ নামটিও তাঁদেরই দেওয়া। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে আবির্ভাবেই এই কমিকস পাঠক এবং বিশেষ করে শিশু মহলে সাড়া ফেলে দেয়। ‘হাঁদা ভোঁদা’ ৫৩ বছর ‘শুকতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সৃষ্টি করেন ‘বাঁটুল দি গ্রেট’। এটিই তাঁর আঁকা প্রথম রঙিন কমিক স্ট্রিপ (লাল ও কালোর বাই কালারে নির্মিত)। পরবর্তীতে তিনি জানান একদিন কলকাতার কলেজ স্ট্রিট থেকে ফেরার সময় তাঁর মাথায় সুপারহিরোর চিন্তাভাবনা চলছিল। সেখান থেকেই বাঁটুল চরিত্রটির ভাবনা তাঁর মাথায় আসে। ডেসপারেট ড্যান চরিত্রের সঙ্গে বাটুলের কিছুটা মিল রয়েছে। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে সৃষ্টি করেন আরেক বিখ্যাত কমিকস ‘নন্টে ফন্টে’। ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকার অনুরোধে তাঁদের জন্য আঁকেন ‘ব্ল‍্যাক ডায়মন্ড ইন্দ্রজিৎ রায়’ এবং ‘পটলচাঁদ দ্য ম্যাজিশিয়ান’। এ ছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য কমিক স্ট্রিপগুলি হল- ‘বাহাদুর বেড়াল’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৮২), ‘ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু’, ‘গোয়েন্দা কৌশিক রায়’, ‘পেটুক মাস্টার বটুকলাল’, ‘শুঁটকি আর মুটকী’, ‘বুদ্ধিমান কুকুর’ ইত্যাদি। আপামর বাঙালি শিশু-কিশোরদের কাছে উপরোক্ত কাজগুলির জন্যই তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা: নারায়ণ দেবনাথ সারাজীবন তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বহু পুরস্কার পেয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-বঙ্গভূষণ (২০১৩), সাহিত্য আকাদেমি (২০১৩) এবং পদ্মশ্রী (২০২১)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তিনি একমাত্র ভারতীয় কার্টুনিস্ট যিনি ডিলিট উপাধি পেয়েছেন।

মৃত্যু: ২০২১-এর ২৪ ডিসেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে ভরতি হন। ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি তিনি ৯৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন।

6. প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো।

জন্মঃ ৬ নভেম্বর ১৯৩০ ঢাকা, বাংলাদেশ।

পিতাঃ অভিমন্যু বন্দ্যোপাধ্যায়।

মাতা: লাবণ্যপ্রভা দেবী।

শিক্ষাঃ সোনার গাঁও পানাম বিদ্যালয়, দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলার মুরশিদাবাদ শহরে বানজেটিয়া গ্রামে বসবাস। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিকম পাস পরে বিটি পাস।

কর্মজীবন: যাযাবরের ন্যায় বহুধা বিভক্ত নাবিকরূপে বিশ্বভ্রমণ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, মুরশিদাবাদের সাটুইসিনিয়র বেসিক স্কুল-এ প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ, কলকাতায় কারখানার ম্যানেজার, প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা, ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সম্পাদনার কাজ।

সাহিত্যকর্ম: প্রথম গল্প ‘কার্ডিফের রাজপথ’, বহরমপুরের ‘অবসর’ পত্রিকায় প্রকাশ, প্রথম উপন্যাস ‘সমুদ্র মানুষ’ (১৯৫৮), সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ (১৯৭১)। অন্যান্য উপন্যাসগুলি- ‘অন্নভোগ’ (১৯৯০), ‘অলৌকিক জলযান’,

‘ঈশ্বরের বাগান’, ‘ঝিনুকের নৌকো’, ‘তখন হেমন্তকাল’, ‘দুই ভারতবর্ষ’, ‘দুঃখিনী বর্ণমালা মা আমার’, ‘দ্বিতীয় পুরুষ’, ‘ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’, ‘নম্ন ঈশ্বর’, ‘পঞ্চযোগিনী’, ‘পাগলিনী রাধা’, ‘পালকের টুপি’, ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘শঙ্খচিলের ডানা’, ‘সমুদ্রে বুনো ফুলের গন্ধ’, ‘সুন্দর অপমান’, ‘সোহাগপুর’, ‘স্বর্গের খেলনা’ ইত্যাদি।

শিশু-কিশোরদের জন্য লেখাঃ অরণ্য রাজ্যে ম্যান্ডেলা, ‘উড়ন্ত তরবারি’, একটি জলের রেখা ও ওরা তিনজন’, ‘গিনি রহস্য’, ফেনতুর সাদা ঘোড়া’, ‘দুষ্টু হাতিটি’, ‘নীল তিমি’, বিশ্বিরি বইলাল বাতাসা, রাজার বাড়ি, হীরের চেয়েও দামী। ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

পুরস্কার ও সম্মাননা: মানিক স্মৃতি পুরস্কার ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে ‘সমুদ্র মানুষ-এর জন্য। বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কার ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে। ভুয়ালকা পুরস্কার ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ‘পঞ্চযোগিনী’-র জন্য। বঙ্কিম পুরস্কার ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে দুই ভারতবর্ষ-এর জন্য। মতিলাল পুরস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও সুধা পুরস্কার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ‘পঞ্চাশটি গল্প’-এর জন্য।

মৃত্যুঃ ১৯ জানুয়ারি, ২০১৯। বার্ধক্য জনিত কারণে।

উত্তর:

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম্য ও পারিবারিক পরিচয়ঃ অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের ঢাকায় অবস্থিত আড়াই হাজার থানার রাইনাদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম অভিমন্যু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম লাবণ্যপ্রভা দেবী। তাঁর পিতা মুড়াগাছার জমিদারের অধীনে কর্মরত ছিলেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর গ্রামের বাড়িতে যৌথ পরিবারে কেটেছে।

শিক্ষাজীবন: তিনি প্রথমে সোনারগাঁও-এর পানাম বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। দুর্ভাগ্যবশত দেশভাগ হলে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবার ছিন্নমূল হয়ে বাধ্যত এপার বাংলায় চলে আসেন। এই দেশভাগের যন্ত্রণাময় প্রকাশ তাঁর বহু গল্প উপন্যাসে স্থায়ী দাগ রেখে গিয়েছে। এই বাংলায় এসে মুরশিদাবাদ জেলার বহরমপুরে বানজেটিয়া গ্রামে গড়ে ওঠা মণীন্দ্র কলোনিতে আশ্রয় নেন তাঁরা। সেখান থেকেই প্রবেশিকা পরীক্ষাও দেন। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিকম পাশ করেন। তারপর বিটি ট্রেনিং নেন।

কর্মজীবনঃ  তাঁর কর্মজীবন প্রবল বৈচিত্র্যময়। কখনও তিনি জাহাজে নাবিকের কাজ নিয়ে গোটা পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন; আবার কখনও ট্রাকে ক্লিনারের কাজ নিয়েও ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন স্থানে। প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন তিনি। অল্প কিছুদিন তিনি আবার মুরশিদাবাদ জেলার চৌরিগাছা স্টেশনের কাছে সাটুই সিনিয়র বেসিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন। এরপর তিনি ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় এসে কখনও তিনি কারখানার ম্যানেজার হিসেবে আবার কখনও প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর অমিতাভ চৌধুরীর আমন্ত্রণে তিনি ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে চাকরিতে ঢোকেন। পরবর্তীতে এখান থেকেই অবসরগ্রহণ করেন।

সাহিত্যজীবনঃ অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় যখন যে পেশাতে ছিলেন, প্রতিটি সময়ে সমান্তরালভাবে সাহিত্য সৃজন করে গেছেন। বহুধা বিচিত্র পেশার বিপুল অভিজ্ঞতা তাঁর রচনাকে বরাবর সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর প্রথম গল্প ‘কার্ডিফের রাজপথ’ প্রকাশিত হয় বহরমপুরের ‘অবসর’ পত্রিকায়। ওয়েলসের বন্দর শহরের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন গল্পটি। জাহাজ জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘সমুদ্র মানুষ’। বন্ধুদের আগ্রহে উপন্যাসটি ‘উল্টোরথ’ পত্রিকার উপন্যাস প্রতিযোগিতায় পাঠিয়ে ‘মানিক-স্মৃতি পুরস্কার’ লাভ করেন। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’। এই উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, তৃতীয় পর্ব ‘অলৌকিক জলযান’ এবং চতুর্থ পর্ব ‘ঈশ্বরের বাগান’। দেশভাগের অপরিসীম যন্ত্রণা এবং উদ্বাস্তু মানুষের জীবন সংগ্রাম এই উপন্যাসগুলির মুখ্য পটভূমি। তাঁর আরও কিছু বিখ্যাত উপন্যাস হল- অতীন্দ্রিয় অলৌকিকের অন্তরালে, অন্তর্গত খেলা, অন্নভোগ, অপহরণ, অমৃতা, অমৃত্যু, অরণ্য, উত্তাপ, উপেক্ষা, ঋতু-সংহার, একজন দৈত্য একটি লাল গোলাপ, উত্তাপ, বিভ্রম, পুতুল, রাজা যায় বনবাসে, শঙ্খচিলের ডানা, সবুজ শ্যাওলার নীচে, নদীর সঙ্গে দেখা, সমুদ্রে বুনোফুলের গন্ধ, সাগর জলে, সাগরে মহাসাগরে, সাদা জ্যোৎস্না, সুখী রাজপুত্র, সুন্দর অপমান, সোহাগপুর, স্বর্গ খেলনা ইত্যাদি। ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের উদ্যোগে মোট বারোটি প্রধান ভাষায় তাঁর উপন্যাসের অনুবাদ হয়েছে।

পুরস্কারঃ তিনি বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কার, ভুয়ালকা পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও সুধা পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ইত্যাদি পেয়েছেন।

মৃত্যুঃ ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি ৮৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

7. প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে প্রখন্ত্র রচনা করো।

জন্মঃ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি।

বাবা: সত্যানন্দ দাশ।

মাঃ কুসুমকুমারী দাশ।

ছোটোবেলায় পড়াশোনা: বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয়।

কলেজজীবন: ব্রজমোহন কলেজ এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ, পরে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

কর্মজীবন : সিটি কলেজ, বাগেরহাট কলেজ, রামযশ কলেজ, ব্রজমোহন কলেজ, খঙ্গপুর কলেজ, বড়িষা কলেজ, হাওড়া গার্লস কলেজে অধ্যাপনা।

প্রথম কবিতা মুদ্রণ: ১৩২৬ বঙ্গাব্দে ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকায়।

প্রথম কাব্যগ্রন্থঃ ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ‘ঝরাপালক’।

অন্যান্য কাব্যগ্রন্থঃ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা-অবেলা-কালবেলা’ ইত্যাদি।

কবিতার বৈশিষ্ট্য: চিত্ররূপময়তা এবং নাগরিক মানুষের পালটে যাওয়া জীবনবোধ।

রচিত উপন্যাস: ‘জলপাইহাটি’, ‘মাল্যবান’, ‘সুতীর্থ’, ‘কারুবাসনা’ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধঃ ‘কবিতার কথা’।

মৃত্যুঃ ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর, ট্রাম দুর্ঘটনায়।

উত্তর:

কবি জীবনানন্দ দাশ

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়: কবি জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতবর্ষের (বর্তমান বাংলাদেশের) বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন, কিন্তু পড়ে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক এবং বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক। ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকারও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন তিনি। জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশও কবিতা লিখতেন। তাঁর লেখা কবিতার পঙক্তি- ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে। কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে’ অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল তৎকালে।

শিক্ষাজীবনঃ আট বছর বয়সে তাঁকে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভরতি করা হয়। এই স্কুল থেকেই তিনি ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দুবছর পর ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইনটারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর কলকাতায় এসে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন তিনি।

কর্মজীবনঃ জীবনানন্দ দাশ ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্ম সমাজ পরিচালিত সিটি কলেজে টিউটর হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য বিনা কারণে তাঁর চাকরি চলে যায়। এরপর সারাজীবন তিনি বহু জায়গায় চাকরির চেষ্টা করেছেন এবং নানান জায়গায় চাকরি পেয়েও টিকিয়ে রাখতে পারেননি। তাই আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য কোনোদিনই তাঁর জীবনে ছিল না। বিভিন্ন সময়ে তিনি খুলনার বাগেরহাট কলেজ, দিল্লির রামযশ কলেজ, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ, খড়গপুর কলেজ, বড়িশা কলেজ, হাওড়া গার্লস কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর কর্মজীবন ছিল অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সমস্যায় পরিপূর্ণ।

সাহিত্যকর্ম: দীনেশরঞ্জন দাস সম্পাদিত ‘কল্লোল’ পত্রিকায় তাঁর ‘নীলিমা’ নামক একটি কবিতা প্রকাশিত হলে বাংলা সাহিত্য জগৎ প্রথম তাঁর সন্ধান পায়। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’। এখানে তাঁর প্রতিভার যথাযথ প্রকাশ পায়নি। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ থেকে তাঁর স্বক্রিয়তা এবং কবিত্বশক্তির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায়। ‘বনলতা সেন’ কাব্য তাঁকে কিছুটা জনপ্রিয়তা দিলেও সার্বিকভাবে তাঁর কবিতা নিয়ে তৎকালে নানান বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে তাঁর কবিতার বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ ওঠে। আসলে সমসময়ের বাংলার অধিকাংশ সাহিত্যিক এবং সাহিত্য সমালোচক তাঁর কবিতাকে যথার্থ অনুধাবন করতেই পারেননি। ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার সম্পাদক সজনিকান্ত দাসের মতো অনেকেই তাঁর নামে অহেতুক সমালোচনা করেছেন সেই সময়ে। বুদ্ধদেব বসু, সঞ্চয় ভট্টাচার্যের মতো কয়েকজন মাত্র তাঁর কবিতা নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল-‘মহাপৃথিবী’, ‘বেলা-অবেলা-কালবেলা’, ‘রূপসী বাংলা’ (তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত)।

জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় গল্প, উপন্যাস প্রকাশ করেননি। তাঁর মৃত্যুর পর ট্রাংক থেকে অনেক পান্ডুলিপি উদ্ধার করা হয় এবং তা সম্পাদনা করে একে একে প্রকাশিত হয়। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হল- ‘মাল্যবান’, ‘কারুবাসনা’, ‘জলপাইহাটি’, ‘সুতীর্থ’, ‘বাসমতীর উপাখ্যান’, ‘সফলতা নিষ্ফলতা’ ইত্যাদি। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি নানান বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ‘কবিতার কথা’ নামক প্রবন্ধ গ্রন্থটি পাঠক মহলে আজও সমান জনপ্রিয়।

মৃত্যুঃ ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর ট্রাম দুর্ঘটনায় তাঁর অকালপ্রয়াণ ঘটে।

৮. প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো :

জন্ম: ১৮৯৪, ১২ সেপ্টেম্বর, উত্তর চব্বিশ পরগনা, মুরাতিপুর গ্রাম।

পিতা-মাতাঃ পিতা-মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা-মৃণালিনী দেবী।

শিক্ষাজীবন: বনগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়, রিপন কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

কর্মজীবন: শিক্ষকতা, পূর্ণিয়া জেলায় জঙ্গল মহল তদারকির ম্যানেজার।

সাহিত্যকর্ম: ‘পথের পাঁচালী’, ‘আরণ্যক’, ‘অপরাজিত’, ‘ইছামতী’, ‘আদর্শ হিন্দুহোটেল’, ‘দেবযান’, ‘মৌরীফুল’ (ছোটোগল্প), ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘হীরা মানিক জ্বলে’ (শিশুসাহিত্য)।

প্রকৃতিপ্রেম: প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়তা।

মৃত্যু: ১৯৫০, ১ নভেম্বর।

উত্তর:

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তর চব্বিশ পরগনার কাঁচড়াপাড়ার কাছে মুরাতিপুর গ্রামে মামার বাড়িতে ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁর কাছে বারাকপুর গ্রামে। তাঁর প্রপিতামহ ছিলেন কবিরাজ। আর তাঁর পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত। পাণ্ডিত্য এবং কথকতার জন্য তিনি ‘শাস্ত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর মায়ের নাম মৃণালিনী দেবী। পিতা-মাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড়ো।

শিক্ষাজীবন: বিভূতিভূষণের পড়াশোনার সূত্রপাত হয় পিতার কাছে। গ্রামের পাঠশালায় কিছুদিন পড়ে তিনি ভরতি হন বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর রিপন কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও পাঠ সমাপ্ত করেন তিনি।

কর্মজীবন: জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি শিক্ষকতা করে কাটিয়েছেন। মাঝে কিছুদিন গোরক্ষিণী সভার প্রচারক হিসেবে বাংলা, ত্রিপুরা ও আরাকানের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেন। এরপর খেলাৎচন্দ্র ঘোষের বাড়িতে প্রথমে সেক্রেটারি, তারপর গৃহশিক্ষক এবং শেষে তাঁর এস্টেটের ভাগলপুর সার্কেলের সহকারী ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিনের জন্য ধর্মতলায় খেলাৎচন্দ্র মেমোরিয়াল স্কুলে শিক্ষকতাও করেন। এরপর বনগাঁর গোপালনগর হরিপদ ইন্সটিটিউশনে যোগ দেন এবং সেখানেই আমৃত্যু শিক্ষকতা করেন।

সাহিত্যজীবন: ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘উপেক্ষিতা’ গল্প প্রকাশের মধ্যে দিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য জীবনের সূত্রপাত হয়। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ভাগলপুরে কর্মরত থাকাকালীন তিনি ‘পথের পাঁচালী’ লেখা শুরু করেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে রাতারাতি তিনি বিখ্যাত হয়ে যান। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায় এই বইটি নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করলে গোটা বিশ্বের দরবারে তাঁর নাম আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়ে। ভাগলপুরের চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ‘আরণ্যক’ উপন্যাসটি লেখেন, যা তাঁকে পুনরায় জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এ ছাড়াও তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হল- ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘বিপিনের সংসার’, ‘দেবযান’, ‘দুই বাড়ি’, ‘অনুবর্তন’, ‘অশনি সংকেত’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘ইছামতী’ ইত্যাদি।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটোগল্পও ভীষণভাবেই পাঠক প্রিয়তা অর্জন করেছে। বাংলার প্রতিটি শ্রেষ্ঠ পত্রপত্রিকায় তাঁর ছোটোগল্প নিয়মিত প্রকাশিত হত। তাঁর প্রধান গল্পগ্রন্থগুলির নাম- ‘মেঘমল্লার’, ‘মৌরিফুল’, ‘যাত্রাবাদল’, ‘জন্ম ও মৃত্যু’, ‘নবাগত’, ‘তালনবমী’, ‘উপলখণ্ড’, ‘বিধুমাস্টার’, ‘মুখোশ ও মুখশ্রী’, ‘কুশল-পাহাড়ি’ ইত্যাদি। কিশোরদের জন্যও তিনি অনন্যসাধারণ এমন কিছু বই লিখেছেন, যা দশকের পর দশক ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কিশোর কিশোরীদের মুগ্ধ, বিস্মিত করে রেখেছে। সেগুলি হল- ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’, ‘মিসমিদের কবচ’, ‘হীরা মাণিক জ্বলে’ ইত্যাদি। এ ছাড়াও তাঁর ভ্রমণ কাহিনি এবং দিনলিপিও পাঠকের কাছে সমান জনপ্রিয়। সেই বইগুলির নাম- ‘অভিযাত্রিক’, ‘স্মৃতির রেখা’, ‘তৃণাঙ্কুর’, ‘ঊর্মিমুখর’, ‘বনে পাহাড়ে’, ‘উৎকর্ণ’, ‘হে অরণ্য কথা কও’ ইত্যাদি।

পুরস্কার ও সম্মাননা: ‘ইছামতী’ উপন্যাসের জন্য তিনি মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর জন্মস্থানের কাছে অবস্থিত পারমাদান অভয়ারণ্যের নাম রাখা হয়েছে ‘বিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’। এ ছাড়া তাঁর নামে স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হয়।

মৃত্যু: ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বর ঝাড়খণ্ডের ঘাটশিলাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর প্রয়াণ ঘটে।

৯. প্রদত্ত সূত্র এ তথ্য ভঅবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো।

জন্মঃ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মে, বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরে।

পরিচয়ঃ চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং সাংস্কৃতিক কর্মী। একসময় যুক্ত ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে।

শিক্ষাজীবন: ফরিদপুরে প্রাথমিক শিক্ষা। পরে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা।

চলচ্চিত্র জমতে অবদান। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রাতভোর’ প্রথম ছবি। দ্বিতীয় ‘নীল আকাশের নীচে’ ও তারপরে ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবি দুটি তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। ১৯৬৯-এ ‘ভুবনসোম’ ছবিটি তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। অস্থির কলকাতার চালচিত্রকে তুলে ধরে তাঁর কলকাতা ট্রিলজি ‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭১), ‘কলকাতা’ ৭১’ (১৯৭২) এবং ‘পদাতিক’ (১৯৭৩)। এ ছাড়াও বাংলা ও হিন্দি ভাষায় তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি হল ‘মৃগয়া’, ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘খারিজ’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘খন্ডহর’ ইত্যাদি।

পুরস্কার: ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ‘খারিজ’ ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মানিত হয়। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে পেয়েছেন ভারত সরকারের পদ্মভূষণ পুরস্কার এবং ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘দাদাসাহেব ফালকে’। এ ছাড়াও ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান এবং ২০০০-এ রাশিয়ান সরকারের ‘অর্ডার অফ ফ্রেন্ডশিপ’ পেয়েছেন।

জীবনাবসান : ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর।

উত্তরঃ

মৃণাল সেন

জন্ম, শিক্ষা ও ব্যক্তিজীবনঃ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মে পূর্ববঙ্গের অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরে মৃণাল সেন জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদপুরেই তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর কলকাতায় এসে স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় বিএ এবং এমএ পাশ করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখায় যোগ দেন। কিন্তু পরবর্তীতে কখনও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। চারের দশকে তিনি ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের (ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ) সঙ্গো যুক্ত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি কিছুদিন সাংবাদিকতা এবং ওষুধ বিপণনকারী হিসেবে কাজও করেছেন। অভিনেত্রী গীতা সোমকে (পরবর্তীতে সেন) তিনি বিবাহ করেন।

চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনঃ মৃণাল সেন পরিচালিত প্রথম ছবি ‘রাত-ভোর’ (১৯৫৫)। এই ছবিটি একেবারেই সাফল্য পায়নি। আসলে তিনি যেমন ছবি করতে চাইতেন, তেমনটি করার সুযোগ প্রথম ছবিতে তিনি পাননি। প্রযোজকের কথা অনুযায়ী তাঁকে পরিচালনা করতে হয় তখন। এরপর ‘নীল আকাশের নীচে’ এবং তৃতীয় ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’ থেকে তাঁর পরিচিতি অনেক বেড়ে যায়। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে উৎপল দত্ত অভিনীত মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় এবং তাঁর খ্যাতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে পৌঁছে যায়।

মৃণাল সেনের কলকাতা ট্রিলজির মাধ্যমে সমসাময়িক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও সমাজ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এই তিনটি সিনেমা হল-‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭১), কলকাতা ৭১ (১৯৭২) ও ‘পদাতিক’ (১৯৭৩)। মধ্যবিত্ত সমাজের ঠুনকো নীতিবোধ, সামাজিক ভণ্ডামিকে তুলে ধরেন ‘একদিন প্রতিদিন’ (১৯৭৯) এবং ‘খারিজ’ (১৯৮২) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। দ্বিতীয় ছবিটি ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পায়। তাঁর পরিচালিত ‘আকালের সন্ধানে’ (১৯৮০) সিনেমাটিও বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পায়। এ ছাড়াও ‘মৃগয়া’, ‘খণ্ডহর’, ‘মহাপৃথিবী’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। তাঁর পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র ‘আমার ভুবন’ ২০০২-এ মুক্তি পায়।

সাহিত্য জীবন : মৃণাল সেন শুধু পরিচালনাই করতেন না, চিত্রনাট্যও লিখতেন নিজেই। পাশাপাশি চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে বেশ কিছু মূল্যবান বইও তিনি রচনা করেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ‘চার্লি চ্যাপলিন’, ‘সিনেমা, আধুনিকতা’, ‘ডিউস অন সিনেমা’, ‘মন্টেজ: লাইফ, পলিটিক্স, সিনেমা’, ‘অলঅয়েজ বিয়িং বন’ ইত্যাদি।

১০. প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো:

জন্মঃ ২৫ নভেম্বর ১৯২৫, শিবপুর, হাওড়া, বেঙ্গাল, ব্রিটিশ ভারত।

পরিবার: পিতা হেমচন্দ্র দেবনাথ এবং মাতা রমণসোনা দেবী। তিন ভাইবোনের মধ্যে বড়ো ছেলে নারায়ণ। পরিবারের স্বর্ণের ব্যাবসা। কিন্তু নারায়ণ দেবনাথের সেদিকে ঝোঁক ছিল না।

শৈশব ও বাল্যশিক্ষা: ছোটোবেলা থেকেই তাঁর ঝোঁক চিত্রকলা শিল্পের প্রতি। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে ফাইন আর্টস নিয়ে পড়াশোনা। কিন্তু ডিগ্রি শেষ না করেই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া শিল্পের নেশায় মগ্ন হওয়া।

কর্মজীবন ও সাহিত্যঃ পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ায় বিভিন্ন বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে লোগো তৈরি এবং সিনেমার স্লাইড তৈরির কাজ-এর ফাঁকেই শুরু করেন অনুবাদমূলক লেখা। কালিদাসের লেখা ত্রিবেণীর বাংলা অলংকরণ-এর পরেই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি শুরু করে দেন ‘শুকতারা’-র অলংকরণ এবং প্রচ্ছদের কাজ। ১৯৫০-এর মাঝামাঝি ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকার ‘আনন্দমেলা’-তে কাজ শুরু ১৯৬২-তে হাঁদা ভোঁদার কমিক্স সৃষ্টি, ১৯৬৫-তে তৈরি করলেন রঙিন ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করেন ‘নন্টে ফন্টে’। তারপর ‘কিশোর ভারতী’-তে তৈরি করেন ‘ম্যাজিশিয়ান পটলচাঁদ’ কমিক্স।

মূল্যায়ন: নারায়ণ দেবনাথ সম্পর্কে শান্তনু ঘোষ বলেন, “নারায়ণবাবুর কাছে কমিক আঁকা ছিল একটা নয়টা পাঁচটা চাকরি করার মতো। তিনি এটাকে কখনোই খুব মহান কোনো অর্জন হিসেবে দেখেননি, যেটির কোনো প্রামাণ্য দলিল বা সম্মানের প্রয়োজন। প্রাপ্য স্বীকৃতিটা তার জীবনে অনেক দেরি করে এসেছে। কিন্তু তাই বলে তিনি কখনও নিজের রাস্তা থেকে সরে গিয়ে সেসবের পিছনে ছোটেননি। বিখ্যাত কমিক চরিত্র হাঁদা ভোঁদা (১৯৬২), বাটুল দি গ্রেট (১৯৬৫), নন্টে ফন্টে (১৯৬৯), ব্ল‍্যাক ডায়মন্ড, ইন্দ্রজিৎ রায়, ডিটেকটিভ কৌশিক রায়, বাহাদুর বেড়াল, শুটকি আর মুটকি, পেটুক মাস্টার বটুকলাল, পটলচাঁদ দ্য ম্যাজিশিয়ান।

পুরস্কার ও সম্মাননা: বঙ্গভূষণ (২০১৩), সাহিত্য আকাদেমি (২০১৩), পদ্মশ্রী (২০২১)। একমাত্র তিনিই ভারতীয় কার্টুনিস্ট হিসেবে ডিলিট উপাধি পান।

মৃত্যু: ২০২১-এর ২৪ ডিসেম্বর হৃদরোগের কারণে হাসপাতালে ভরতি। ১৮ জানুয়ারি ২০২২-এ তিনি প্রয়াত হন।

উত্তর:

নারায়ণ দেবনাথ

জন্ম, পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা: নারায়ণ দেবনাথের জন্ম পরাধীন ভারতবর্ষের হাওড়া জেলার শিবপুরে, ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ নভেম্বর। তাঁর পিতার নাম হেমচন্দ্র দেবনাথ এবং মাতার নাম রমণসোনা দেবী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়ো ছেলে। তাঁদের পারিবারিক ব্যাবসা ছিল স্বর্ণের। অর্থাৎ ছোটো থেকেই সচ্ছল পরিবারে মানুষ তিনি। কিন্তু ব্যাবসার দিকে তাঁর আদৌ কোনো ঝোঁক ছিল না। ছোটো থেকেই চিত্রকলা শিল্পের প্রতি তাঁর অদম্য ভালোবাসা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে ভরতি হন। তবে ডিগ্রি সমাপ্ত করেননি। শিল্পের নেশায় মগ্ন হয়ে তিনি নিজস্ব সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন।

সাহিত্য ও কর্মজীবন: পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পর প্রথমে তিনি বিভিন্ন বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে লোগো আঁকতে শুরু করেন। পাশাপাশি চলতে থাকে সিনেমার স্লাইড তৈরির কাজ। এসবের মধ্যেই তিনি মহাকবি কালিদাসের লেখা ত্রিবেণীর বাংলা অনুবাদে অলংকরণ করতে শুরু করেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে তিনি যোগ দেন ‘শুকতারা’ পত্রিকায়। সেখানে অলংকরণ ও প্রচ্ছদের কাজ সাফল্যের সঙ্গে করতে করতেই ১৯৫০-এর মাঝামাঝি ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকার জন্যও আঁকতে থাকেন তিনি।

নারায়ণ দেবনাথ সৃষ্ট প্রথম কমিকস ‘হাঁদা ভোঁদা’। দেব সাহিত্য কুটীরের সম্পাদক মন্ডলীর উৎসাহে তিনি কমিকস রচনায় হাত দেন। উল্লেখ্য, ‘হাঁদা ভোঁদা’ নামটিও তাঁদেরই দেওয়া। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে আবির্ভাবেই এই কমিকস পাঠক এবং বিশেষ করে শিশু মহলে সাড়া ফেলে দেয়। ‘হাঁদা ভোঁদা’ ৫৩ বছর ‘শুকতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সৃষ্টি করেন ‘বাঁটুল দি গ্রেট’। এটিই তাঁর আঁকা প্রথম রঙিন কমিক স্ট্রিপ (লাল ও কালোর বাই কালারে নির্মিত)। পরবর্তীতে তিনি জানান একদিন কলকাতার কলেজ স্ট্রিট থেকে ফেরার সময় তাঁর মাথায় সুপারহিরোর চিন্তাভাবনা চলছিল। সেখান থেকেই বাঁটুল চরিত্রটির ভাবনা তাঁর মাথায় আসে। ডেসপারেট ড্যান চরিত্রের সঙ্গে বাটুলের কিছুটা মিল রয়েছে। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে সৃষ্টি করেন আরেক বিখ্যাত কমিকস ‘নন্টে ফন্টে’। ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকার অনুরোধে তাঁদের জন্য আঁকেন ‘ব্ল‍্যাক ডায়মন্ড ইন্দ্রজিৎ রায়’ এবং ‘পটলচাঁদ দ্য ম্যাজিশিয়ান’। এ ছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য কমিক স্ট্রিপগুলি হল- ‘বাহাদুর বেড়াল’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৮২), ‘ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু’, ‘গোয়েন্দা কৌশিক রায়’, ‘পেটুক মাস্টার বটুকলাল’, ‘শুঁটকি আর মুটকী’, ‘বুদ্ধিমান কুকুর’ ইত্যাদি। আপামর বাঙালি শিশু-কিশোরদের কাছে উপরোক্ত কাজগুলির জন্যই তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা: নারায়ণ দেবনাথ সারাজীবন তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বহু পুরস্কার পেয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-বঙ্গভূষণ (২০১৩), সাহিত্য আকাদেমি (২০১৩) এবং পদ্মশ্রী (২০২১)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তিনি একমাত্র ভারতীয় কার্টুনিস্ট যিনি ডিলিট উপাধি পেয়েছেন।

মৃত্যু: ২০২১-এর ২৪ ডিসেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে ভরতি হন। ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি তিনি ৯৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন।

✏️

এই Post টো Update কৰাত সহায় কৰিব বিচাৰে নেকি?

ইয়াত কিবা ভুল, অসম্পূৰ্ণ তথ্য বা নতুন তথ্য থাকিলে আপুনি এটা উন্নত version প্ৰস্তুত কৰিব পাৰে। Live Post তৎক্ষণাৎ সলনি নহ'ব।

Update This Post

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top